সমুদ্র নাকি পাহাড়? কক্সবাজার নাকি বান্দরবান
পাহাড় আর সমুদ্রের দেশ, আমাদের এই বাংলাদেশ। এ দেশের ভেীগলিক অবস্হানের কারণে আমরা পেয়েছি পাহাড়, সমুদ্র আর অরণ্য ও পর্যটন শিল্প। বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বে ও দক্ষিণ-পূর্বে টারশিয়ারি যুগের পাহাড় ছেয়ে আছে। বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ অরণ্য সুন্দরবন ও দীর্ঘতম প্রাকৃতিক সৈকত কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত যেনো জানান দিচ্ছে তাদের অস্বিত্ব।
প্রকৃতির এই সৌন্দর্যকে জানার জন্য প্রয়োজন দেশ ভ্রমণ। অপরূপ সৌন্দর্যের এই দেশের প্রায় প্রতিটি জেলাতেই রয়েছে বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান। দেশ-বিদেশের বহু পর্যটক ঘুরে বেড়ানোর জন্য প্রতিবছর ভিড় জমিয়ে থাকেন। প্রাচীন স্থাপনা, পাহাড়ে-আহারে, নদীতে নৌকা ভ্রমণ, সমুদ্র, সবুজের মাঝে জ্যোৎস্নার খেলা, এমনকি মেঘের রাজ্যে হারিয়ে যাবার মতো চোখ জুড়ানো পর্যটন স্থান রয়েছে।
চলুন জেনে নেয়া যাক এ দেশের পাহাড় ও সমুদ্র এর বিশলতা সর্ম্পকে:
কক্সবাজার
বিশ্বের সবচেয়ে বড় সমুদ্র সৈকত কক্সবাজার। কক্সবাজারের প্রাচীন নাম পালংকী। একসময় এটি প্যানোয়া নামে পরিচিত ছিল। প্যানোয়া শব্দটির অর্থ ‘হলুদ ফুল।কক্সবাজারের আশপাশের এলাকাগুলো এই হলুদ ফুলে ঝকমক করত বলেই এই নামকরণ। কক্সবাজার তার নৈসর্গিক সৌন্দর্য্যের জন্য বিখ্যাত।
উত্তরে-চট্রগ্রাম, পূর্বে-বান্দরবান পার্বত্য জেলা ও মিয়ানমার, পশ্চিম ও দক্ষিনে-বঙ্গোপসাগর । এখানে শুধু দেশি পর্যটকরা পাশাপাশি বিদেশি পর্যটকদের আনাগোনা চোখে পড়ে।
ঢাকা থেকে সড়ক, রেল ও বিমান সকল পথেই কক্সবাজারের সাথে যোগাযোগ সু ব্যবস্থা রয়েছে। ঢাকা থেকে কক্সবাজারের দূরত্ব ৪৪০ কি.মি.। ঢাকার বিভিন্ন স্থান থেকে কক্সবাজার রুটের বাসগুলো ছেড়ে যায়। তবে সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল, কমলাপুর, মতিঝিল ও আরামবাগ থেকে অধিকাংশ বাস ছেড়ে যায়। ঢাকা থেকে সরাসরি কক্সবাজারের সাথে বিমান যোগাযোগ রয়েছে। ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ইউনাইটেড এয়ারওয়েজের একটি ফ্লাইট প্রতিদিন ঢাকা-কক্সবাজার রুটে চলাচল করে।
কক্সবাজারের পর্যটন শিল্প
কক্সবাজার বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত একটি শহর, মৎস্য বন্দর পর্যটন কেন্দ্র। এখানে রয়েছে বিশ্বের দীর্ঘতম অবিচ্ছিন্ন প্রাকৃতিক বালুময় সমুদ্র সৈকত, যা ১২০ কি.মি. পর্যন্ত বিস্তৃত। এখানে রয়েছে বাংলাদেশের বৃহত্তম সামুদ্রিক মৎস্য বন্দর এবং সাবমেরিন ক্যাবল ল্যান্ডিং স্টেশন। কক্সবাজার শহরের গুরুত্বপূর্ণ ৪টি স্থানে ৪টি ভাস্কর্য (সাম্পান, স্টার ফিস, রূপচাঁদা, ঝিনুক ভাস্কর্য) স্থাপন করা হয়েছে। কক্সবাজারের হাজার বছরের ঐতিহ্য লালদিঘী, গোলদিঘী ও বাজারঘাটা পুকুর। এছাড়া এখানকার বিভিন্ন দ্বীপ যেমন মহেশখালী, কুতুবদিয়া, সোনাদিয়া, শাহপরি, সেন্টমার্টিন দ্বীপ ( স্থানীয় অনেকের কাছে নারিকেল জিঞ্জিরা), মাতাবাড়ি, রয়েছে।
কক্সবাজারে বিভিন্ন উপজাতি বা নৃ-তাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী বাস করে, এইসব উপজাতিদের মধ্যে রাখাইন সম্প্রদায় প্রধান। কক্সবাজার শহর ও এর অদূরে অবস্থিত রামুতে রয়েছে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের পবিত্র তীর্থস্থান হিসেবে বৌদ্ধ মন্দির। কক্সবাজার শহরে যে মন্দিরটি রয়েছে তাতে বেশ কিছু দুর্লভ বৌদ্ধ মূর্তি আছে। পর্যটন শিল্প কেন্দ্র করে এখানে গড়ে উঠেছে অনেক প্রতিষ্ঠান। বেসরকারি উদ্যোগে নির্মিত অনেক কক্সবাজার হোটেল , মোটেল ছাড়াও সৈকতের নিকটেই রয়েছে বেশ কয়েকটি পাঁচতারকা মানের হোটেল।
এছাড়া এখানে পর্যটন শিল্প কেন্দ্র করে পর্যটকদের জন্য গড়ে উঠেছে ঝিনুক মার্কেট। সীমান্তপথে মিয়ানমার (পূর্ব নাম-বার্মা), থাইল্যান্ড, চীন প্রভৃতি দেশ থেকে আসা বাহারি জিনিসপত্র নিয়ে গড়ে উঠেছে বার্মিজ মার্কেট। এখানে রয়েছে দেশের একমাত্র ফিস একুরিয়াম। আরও রয়েছে প্যারাসেলিং, ওয়াটার বাইকিং, বিচ বাইকিং, কক্স কার্নিভাল সার্কাস শো, দরিয়া নগর ইকোপার্ক, কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ কর্তৃক নিমির্ত অসংখ্য স্থাপত্য, ফিউচার পার্ক, শিশুপার্ক এবং অসংখ্য ফোটোসুট স্পট এবং বিলাস বহুল কক্সবাজার হোটেল।
বান্দরবান
বান্দরবান জেলা বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত চট্টগ্রাম বিভাগের একটি প্রশাসনিক অঞ্চল এবংএটি একটি পার্বত্য জেলা। যেহেতু এর পাহাড়,নদী,ঝর্ণা তথা প্রকৃতি সবচেয়ে আকর্ষণ করে বিধায় তাই বান্দরবান জেলা এর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য বিখ্যাত।
বাংলাদেশের সবচেয়ে কম সংখ্যক জনবসতিপূর্ণ জেলা হলো বান্দরবান। বান্দরবান জেলা এর মোট আয়তন প্রায় ৪৪৭৯.০৩ বর্গ কিমি। সাতটি (৭) উপজেলা, সাতটি(৭) থানা নিয়ে গঠিত বান্দরবান জেলাটি। সুদূর অতীতে চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চল নিয়ে ত্রিপুরা রাজ ও আরাকান রাজের মধ্যে দ্বন্দ্ব চলার ফলে অঞ্চলটি বহুবার হাত বদল হয়।
প্রাচীনকালে পার্বত্য অঞ্চলসহ চট্টগ্রাম ছিল বাংলার হরিকেল জনপদের অর্ন্তভূক্ত।বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অন্যতম অংশ হল এদেশের পাহাড়ি অঞ্চল। দেশের দক্ষিণ দিকে রয়েছে পাহাড়ি জেলা এবং এর মধ্যে বান্দরবান জেলা অন্যতম। এ জেলাটিকে সবাই পাহাড়ি কন্যা নামে পরিচিত।
বান্দরবানের দর্শনীয়স্থান
১/ নীলগিরি :
নীলগিরি বাংলাদেশের সর্বোচ্চ পর্যটন স্পট। এই নীলগিরি বান্দরবানের আর্মি ব্রিগেড দ্বারা পরিচালিত। এটি প্রায় ২২০০ ফুট উঁচু এবং বান্দরবান সদর থেকে মাত্র ৪৫ কিলোমিটার দূরে থানচি উপজেলায় অবস্থিত। এই স্পটটির পাশে আপনি ম্রো সম্প্রদায়ের গ্রামগুলি দেখতে পাবেন। বর্ষাকালে পুরো জায়গাটাই মেঘের চাদরে ঢেকে যাওয়ার ফলে এখানে এক মনোরম দৃশ্যের সৃষ্টি হয়। আপনি মেঘের মধ্যে ভেসে বেড়াবেন।হাত দিয়ে মেঘ ধরতে যাবেন কিন্তু পারবেন না।
শীতের মৌসুমে ক্যাম্প ফায়ারের জন্য এটি একটি চমৎকার জায়গা। গ্রীষ্মে ঝকঝকে সূর্যোদয় এবং সূর্যাস্ত এতটাই নজরকাড়া যে এখানে আসার মূল উদ্দেশ্যই হয় এটা উপভোগ করা। সবুজ পাহাড়কে আলোকিত করে পাহাড়ের নীচ থেকে সূর্য উদিত হচ্ছে এবং অস্তও যাচ্ছে। এখান থেকে আপনি সাঙ্গু নদী ও বগালেকের সৌন্দর্যও উপভোগ করতে পারেন।
২/ বগালেক:
বগা লেক বান্দরবানের সুন্দর একটি প্রাকৃতিক হ্রদ। বান্দরবানের রুমা সদর উপজেলা থেকে ১৮ কিলোমিটার দূরে বগা হ্রদ অবস্থিত। এ লেকের আয়তন প্রায় ১৫ একর। বগা হ্রদ বাংলাদেশের সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৩০০০ ফুট উঁচু। বগা হ্রদের জলের রঙ নীল এবং খুব চোখ ধাঁধানো। বগা হ্রদ সৃষ্টির পেছনে রয়েছে অনেক পৌরাণিক কাহিনী।
৩/ চিম্বুক পাহাড় :
চিম্বুক পাহাড় বান্দরবানের আরেকটি বিখ্যাত স্থান।এ জায়গাটিকে বাংলার দার্জিলিংও বলা হয়ে থাকে।কারণ পাহাড়টির চূড়ায় দেখা মেলে মেঘের মেলা।
চিম্বুক বাংলাদেশের তৃতীয় সর্বোচ্চ পর্বত।এ পাহাড়টির গায়ে তৈরি করা হয়েছে রাস্তা যা দিয়ে চূড়ায় পৌঁছানো যাবে।আর চূড়াটিকেও সাজানো হয়েছে পরিপাটি ও পরিকল্পিতভাবে। পাহাড়ের চূড়ায় উঠতে হলে স্থানীয় জীপ ( চান্দের গাড়িতে) উঠতে হবে। তবে অন্যান্য বাহনও উঠতে আশেপাশে সবুজ পাহাড়, বনরাজি আর আঁকাবাকা রাস্তা বেয়ে উপরে ওঠার দৃশ্যও এত সুন্দর যে এটা দেখতেও মানুষ এখানে আসে। আর চূড়ায় আছে নব চত্বর নামে বিশাল এক চত্বর।সাথে কাছাকাছি মেঘ দেখার সুযোগ তো আছেই।এ পাহাড় থেকে কক্সবাজারের সাগর ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন জায়গা দেখা যায়।
৪/ কেওক্রাডং:
Keokradong-কেওক্রাডং
বাংলাদেশ ও মায়ানমার সীমান্তে অবস্থিত বাংলাদেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পর্বত হলো কেওক্রাডং পর্বত।প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর হলেও এ পর্বতটি দূর্গম এলাকায় অবস্থিত। অনেক এডভেঞ্চারপ্রিয় মানুষ শীতে এখানে আসেন।সবুজ কেওক্রাডংয়ের মনোমুগ্ধকর সৌন্দর্য, শীতল ঝর্ণা, আঁকাবাঁকা পাহাড়ি রাস্তার ধার আর পাহাড়ের চূড়ায় মেঘের লুকোচুরির খেলা দেখে আপনি মুগ্ধ হবেন।
৫/ তাজিংডং পাহাড়:
বান্দরবানের বিখ্যাত আরেকটি পাহাড় হল তাজিংডং বা “বিজয়” এটি বাংলাদেশের সর্বোচ্চ পর্বত। তাজিংডং দুর্গম এলাকায় হওয়ায় আগে এখানে পৌঁছানো কষ্টসাধ্য ছিল। তাজিংডং পাহাড় প্রায় ৭৯০ মিটার উঁচু ।
প্রতি বছর প্রচুর পর্যটক তাজিংডং এর সৌন্দর্য উপভোগ করতে ভীড় করে । বিশেষ করে যারা ট্রেকিং করেন তারা এখানে আসেন।কারণ পাহাড় বেয়ে ওঠার স্বাদ নিতে এ পাহাড় অন্যতম জায়গা।পাহাড়ি রাস্তাগুলো বেয়ে বাস বা জীপ যখন ওপরে ওঠে বা নিচে নামে সে দৃশ্যকে অকল্পনীয় মনে হয়।কারণ যত উচুতে উঠবেন ততই মেঘে ঢাকা পড়বে। ফলে অনেক সময় পাহাড়ের চূড়া বা রাস্তা দেখা যায় না।মনে হয় এই বুঝি রাস্তা শেষ, এই বুঝি হারিয়ে যাওয়া কোন এক মায়াবী অরণ্যে।এ পাহাড়ের চারপাশে বিভিন্ন উপজাতি সম্প্রদায় বাস করছে এবং তাদের বৈচিত্র্যময় জীবনযাত্রারও আপনি উপভোগ করতে পারবেন।
৬/ স্বর্ণমন্দির:
বান্দরবান স্বর্ণমন্দিরের জন্যও বিখ্যাত।এখানে এসে স্বর্ণমন্দির না দেখে পর্যটকদের ভ্রমণ যেন সম্পন্ন হবে না, স্থানীয় বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের জন্য নির্মিত এ মন্দির স্বর্ণনির্মিত না হলেও এর সোনালী রঙ যখন রোদের সাথে মিশে যায় তখন সত্যিই সোনার মত আভা ছড়ায়।এ মন্দির দেখতে দেশ বিদেশের অসংখ্য পর্যটক ও বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা আসেন।
৭/ শৈল প্রপাত:
শৈল প্রপাত নামক জলপ্রপাত বা ঝর্ণার জন্যও বান্দরবানক বিখ্যাত কারণ এটি একটি চমৎকার স্থান।বর্ষাকালে এ ঝর্ণার প্রবাহ প্রবল হয়ে ওঠে। তাছাড়া এই ঝর্ণার পানি এতই শীতল এবং স্বচ্ছ যে একে কেন্দ্র করে আশে পাশে দু-তিনটি গ্রাম গড়ে উঠেছে।স্থানীয় লোকদের হস্তশিল্প, তাঁত পণ্য এবং খাবার নিয়ে শৈল প্রপাতের কাছে একটি ছোট বাজার গড়ে উঠেছে ।
৮/ সাঙ্গুনদী:
বাংলাদেশের সাঙ্গু নদী বান্দরবানের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আরেকটি বিখ্যাত অংশ। এই পাহাড়ি নদী হাজার বছর ধরে পাহাড়ের উপর দিয়ে বয়ে চলেছে ।এ নদীর নির্মল স্বচ্ছ পানির সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারবেন। নদীতে ঘুরতে পারবেন ইন্জিন নৌকা বা বোটের সাহায্যে।
৯/ নাফাখুম জলপ্রপাত:
পাহাড়ি কন্যা বান্দরবান জেলার আরেক আকর্ষণ নাফাখুম জলপ্রপাত এবং ভ্রমণের জন্য একটি চমৎকার জায়গা। এগুলো ছাড়াও বান্দরবান আরও অনেক কিছুর জন্যই বিখ্যাত।অতএব পরিশেষে বলা যায়,যারা পাহাড়কে ভালোবাসে তারা পাহাড়কে উপভোগ করতে যেতে পারেন তাজিনডং বা কেওক্রাডং আর যাদের পছন্দ সমুদ্র তারা চলে যেতে পারেন সমুদ্রের কাছাকাছি।ছুটির দিনে নীল সাগর ও পাহাড়ের দেশে, যার কাছে যেটা উপভোগ্য।
Wow
Tnx
Nice
Thank You